(লেখাটি ১৯৯৭ সালে জাপানের The Nihon Keizai Shinbun পত্রিকায় প্রকাশিতCAPITALISM'S MYSTERIOUS TRIUMPH-র বঙ্গানুবাদ,যে পত্রিকার এখনকার নাম The Nikkei)।
কিছুদিন আগে এখানকার স্থানীয় টিভি চ্যানেলে একটি চিত্তাকর্ষক ধারাবাহিক দেখাচ্ছিল- নাম "রাশিয়ার যুদ্ধ"। ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে বানানো এই ধারাবাহিকটি রাশিয়াতে তৈরি, বিষয় হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত রাশিয়ার সংগ্রাম। কাহিনী যে খুব মনোরম তা বলা চলে না: প্রযোজকেরা স্তালিনের হিংস্রতার সমস্ত খুঁটিনাটিগুলো তুলে ধরেছেন নির্দ্বিধায় এবং মহাযুদ্ধের কুৎসিক দিকগুলোকেও জাতীয়তাবাদী রোমান্টিকতা দিয়ে আড়াল করার কোনো চেষ্টা করেন নি। বরং এই প্রায়-কর্কশ সততাই একভাবে সোভিয়েত রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্জনগুলোকে আরো হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। রাশিয়া সামরিক দক্ষতার জোরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হয়নি: রুশ সেনাবাহিনীর শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসারদের অধিকাংশই রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের (গ্রেট পার্জ) বলি হয়েছিলেন। যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে নতুন যে নেতারা উঠে এসেছিলেন তাঁরা নিঃসন্দেহে কর্মদক্ষ হলেও দুরন্ত প্রতিভাবান ছিলেন না, তার উপর তাঁদের নির্দেশ বা পরামর্শগুলো প্রায়ই একজন স্বৈরাচারীর হুকুমে নাকচ হয়ে যেত যাঁর সামরিক জ্ঞান ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সর্বনাশা ভুলে ভরা। রাশিয়ানরা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সে তো জার্মানরাও করেছিল। তবে রাশিয়ানদের জয়ের কারণ কী?
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দাঁড়িয়ে উত্তরটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েতদের এই জয় ছিল প্রধানত উৎপাদনশীলতার জয়। যুদ্ধের প্রথম দিকের মাসগুলোয় রাশিয়া ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, বিপুল সংখ্যক রুশ জনতা যুদ্ধের জন্য স্থানচ্যুত হয় এবং দেশের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে অনেকগুলোই জার্মানদের হাতে চলে যায়। তার পরেও সোভিয়েত উৎপাদকরা জার্মান অস্ত্রশস্ত্রের সঙ্গে গুণগত মানে পাল্লা দেবার মত ট্যাঙ্ক, কামান আর বিমান বানিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, জার্মানদের কল্পনার থেকেও অনেক দ্রুত হারে। বস্তুত স্তালিনগ্রাদ আর কুর্স্ক-এ জার্মানদের চরম পরাজয়গুলোর মূল কারণ হচ্ছে তারা রাশিয়ানদের ক্ষমতাকে অনেকখানি খাটো করে দেখেছিল, হঠাৎ করে হাজার হাজার ট্যাঙ্ক নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করতে সক্ষম একটা রাশিয়ান বাহিনীর অস্তিত্বের কথা তারা ভাবতেই পারেনি।
১৯৯৭ সালে এসে এই ঘটনাগুলোর কী তাৎপর্য? আজকাল আমরা পুঁজিবাদের বিজয়কে আমাদের উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত বলেই ধরে নিই। বাজার অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা যে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির থেকে ঢের বেশি, এ সত্য উত্তর কোরিয়া আর কিউবা ছাড়া মোটামুটিভাবে গোটা পৃথিবীই মেনে নিয়েছে। কিউবার অর্থনীতি ক্রমশ ভিতর থেকে ভেঙে পড়ছে, আর উত্তর কোরিয়ার মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে। সত্যি বলতে কি, প্রত্যেক বার যখন একটা কমিউনিস্ট শাসনতন্ত্র ভেঙে পড়ে, দেখা যায় যে তাদের দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা যা ভাবা গিয়েছিল তার থেকেও ঢের বেশি খারাপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কমিউনিস্ট জমানার পতনের আগে অনুমান করা হত, পূর্ব জার্মানির রিয়েল জিডিপি পশ্চিম জার্মানির জিডিপির ৭০% থেকে ৮০%-র মধ্যে, অর্থাৎ পশ্চিম জার্মানির কিছু অঞ্চলের থেকেও পূর্ব জার্মানি সমৃদ্ধ। কিন্তু বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার পর পশ্চিমের পর্যবেক্ষকরা দেখলেন পূর্ব জার্মানির অর্থনীতির অবস্থা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মত করুণ, আদিম প্রযুক্তির সব কারখানা (যারা ভয়াবহ পরিবেশদূষণ ছড়াতো) অত্যন্ত নিম্নমানের ভোগ্যপণ্য তৈরি করছে (যেমন পূর্ব জার্মানির কুখ্যাত গাড়ি ট্রাবান্ট, যার তুলনায় হণ্ডা বা ফোর্ডের গাড়িকেও মনে হবে মার্সিডিজের মত চোখ ধাঁধানো)। ভাবা হয়েছিল সোভিয়েত অর্থনীতি আকারে অন্তত মার্কিন অর্থনীতি অর্ধেক, অর্থাৎ জাপানের থেকে বড়। কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রাশিয়া আর্থিক সামর্থ্যে এমনকি ইতালির থেকেও পিছিয়ে। আমরা ভেবেছিলাম সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদের মধ্যে সত্যিই হয়তো প্রযুক্তির লড়াই চলছে: এখন দেখা যাচ্ছে রুশ প্রযুক্তির প্রতীক হচ্ছে টুটাফাটা মীর মহাকাশকেন্দ্র। এখন অনেকেই বুঝতে পারছেন কমিউনিস্টরা উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিবিদ্যার যে সব দাবিগুলো করত, চোখ ধাঁধানো সব বাঁধ আর ইস্পাতকঠিন রুশী শ্রমিকদের ছবি-টবি দিয়ে, সে সব নেহাতই প্রোপাগাণ্ডা ছিল। বাস্তবে আমরা এইটুকুই শিখলাম যে সমাজতন্ত্র এমনই একটি ব্যবস্থা যা প্রয়োজনীয় পণ্য আর পরিষেবার যোগানই দিয়ে উঠতে পারে না, কিন্তু পুঁজিবাদ পারে।
কিন্তু 'রাশিয়ার যুদ্ধ' থেকে বোঝা যায়, ব্যাপারটা এতখানিও সরল নয়। তবে কি স্তালিনের আমলে রাশিয়ার উৎপাদনশীলতার বিজয় নেহাতই একটা ধাপ্পাবাজি ছিল? বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করা যে সব জার্মান সৈন্যরা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের কথাটা বলে দেখুন একবার! সত্যি কথাটা হচ্ছে, স্তালিন সত্যিই রাশিয়াকে একটা প্রকাণ্ড শিল্পশক্তিতে পরিণত করেছিলেন, আর তাদের শক্তির চরম পরীক্ষাও হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। স্তালিনের উত্তরাধিকারীরাও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রকৃতই সাফল্য অর্জন করেছিলেন, শুধুমাত্র মহাকাশচারীদের মহাশূন্যে পাঠানোর মত লোক দেখানো সাফল্যই নয়, সত্যিই একটা উন্নতমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে রাশিয়া কোনোদিনই খুব উন্নতমানের ভোগ্যপণ্য বানিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু আজ আমরা যেমন ভাবি, সোভিয়েত রাশিয়ার চিরদিন এতটা অযোগ্য দৈন্যদশা ছিল না। পুঁজিবাদের জয় এবং সমাজতন্ত্রের ধ্বংসের পিছনে সাধারণত যে প্রচলিত গল্পগুলো শোনা যায় তার বাইরে আরও কিছু অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে। বাজার অর্থনীতি যে কেন্দ্রীয় অর্থনীতির থেকে বেশি দক্ষতাসম্পন্ন শুধু সেটুকু বললেই বিষয়টা মিটে যায় না। সে বক্তব্যে বিশেষ কোনো ভুল নেই, কিন্তু জরুরি প্রশ্নটা হল, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে পুঁজিবাদের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছিল তা আশির দশকে এভাবে ভেঙে পড়ল কেন? সমস্যাটা কোথায় হল?
একটা উত্তর হতে পারে যে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামোটা বদলে গিয়েছে। যখন দোদর্ণ্ডপ্রতাপ কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ জুগাশভিলি নিজের নাম দিলেন স্তালিন, অর্থাৎ লৌহমানব, তার মধ্যে সেই সময়টার চরিত্র ফুটে উঠেছিল যখন ভারী শিল্প দেশের অর্থনীতির চরিত্রটা নিয়ন্ত্রণ করত, আর প্রকাণ্ড সব লৌহ-ইস্পাতশিল্পের কেন্দ্রগুলো ছিল উন্নতির প্রতীক। আজ শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়, পৃথিবীর সমস্ত ইস্পাত উৎপাদক এলাকাগুলো মন্দার কবলে পড়েছে, যেমন ধরুন দক্ষিণপূর্ব বেলজিয়াম। ব্যাপারটা শুধু ইস্পাত শিল্প নয়: আসলে সেই সময়টা চলে গেছে যখন রাষ্ট্র বা বড় কোম্পানিগুলো অতিকায় সব কারখানায় ভারী শিল্পোৎপাদন করে দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারত। কেউ বলতে পারেন পুরোনো দিনের ভারী শিল্পের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থনীতিই ছিল সুবিধাজনক; কিন্তু নতুন প্রযুক্তি, বিশেষত মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির জন্য উপযুক্ত। যতদিন পর্যন্ত প্রযুক্তির দৌড়ে বিরাট সব রকেট বানানো হচ্ছিল, ততদিন তবু রাশিয়া কিছুটা পাল্লা দিতে পেরেছিল। কিন্তু পশ্চিমের দেশগুলো যখন ছোট্ট একটা চিপের মধ্যে একটা কম্পিউটার বসিয়ে দেওয়া শুরু কর, তখন তারা আর এঁটে উঠতে পারল না। সত্যি কথা বলতে কী, ইদানীং সিলিকন ভ্যালির ছোট্ট ছোট্ট স্টার্টআপগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জাপানের বিশাল কর্পোরেশনগুলোকেও মনে হচ্ছে ডাইনোসরের মত আদিম আর শ্লথ।
আর একটা সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে এই যে পুঁজিবাদের জয়ের কারণ বিশ্বায়ন, যা নিয়ে আমরা সকলেই কথা বলছি কিন্তু কেউই বিষয়টা পুরোটা বুঝে উঠতে পারছি না। কোনোভাবে, হয়তো বিগত প্রজন্মে ক্রমহ্রাসমান শুল্ক হার, সস্তা পরিবহন এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কোনো মিথস্ক্রিয়ার ফলে, বহু দেশের পক্ষে দ্রুত শিল্পায়নের পথে হাঁটা সম্ভব হয়েছে: সরকারি উদ্যোগে বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বের মুক্ত বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে, বাজারের ওঠাপড়ার উপরে ছেড়ে দিয়ে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বিশ্বায়নের এই নতুন সুযোগটা নিতে না পেরে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে।
কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতি বা বিশ্বায়ন কোনোটা দিয়েই একটা ব্যাপার ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো শুধু যে পশ্চিমের অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে নি তাই নয়, তারা ক্রমশ ধারাবাহিকভাবে অবনতির দিকে গেছে এবং অবশেষে ভেঙে পড়েছে। আর্থিক উন্নতির যে স্তরে তারা একদা ছিল, তারা কেন অন্তত সেইটুকুও ধরে রাখতে পারল না?
আমার মনে হয় না সঠিক উত্তরটা নিশ্চিতভাবে কেউই জানেন, কিন্তু একটা যুক্তিসঙ্গত অনুমান করা যেতে পারে: মূল সমস্যাটা প্রযুক্তিগত নয়, বরং নৈতিক। সাম্যবাদ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে মানুষ সাম্যবাদে বিশ্বাস হারিয়েছে বলে, এর উল্টোটা নয়।
মানুষের বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের উপর নির্ভর না করেই কিন্তু বাজার অর্থনীতি কার্যকরী হয়ে থাকে। আপনি পুঁজিবাদকে অপছন্দ করতে পারে, এমনকি বিশ্বাস করতে পারেন যে একদিন পুঁজিবাদের পতন ঘটবে, কিন্তু তার পরেও আপনি আপনার পেশায় প্রতিদিনের কাজটা করে যান, কারণ ওই কাজ থেকে পাওয়া রোজগারের টাকাটা আপনার পরিবারের নিতান্ত প্রয়োজন। স্বার্থপর আর নৈরাশ্যবাদীদের সমাজেও পুঁজিবাদ কার্যকরী হতে পারে, এমনকি পল্লবিত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যে অর্থনীতি বাজারভিত্তিক নয় তার পক্ষে এটা অসম্ভব। সেখানে শ্রমিকদের নিজেদের কাজটা ভালো করে করার বা ম্যানেজারদের ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নেবার ব্যক্তিগত প্রণোদনা নিতান্তই কম। সোভিয়েতের শেষ বছরগুলোয় কর্মীরা জেনেই গিয়েছিল যে তারা যেমনই পরিশ্রম করুক না কেন মাইনে ঠিক জুটেই যাবে, ম্যানেজাররা জানত পদোন্নতি নির্ভর করছে কর্মদক্ষতার বদলে রাজনৈতিক খুঁটির জোরের উপরে, আর অপছন্দের আর ঝুঁকির কাজগুলো করতে কেউই রাজি ছিল না কারণ সে জন্য যথেষ্ট পুরষ্কারের ব্যবস্থা থাকত না (আমেরিকার মত দেশে হাজার হাজার সফল ব্যবসায়ী ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের জীবনযাপনের যে মান, রাশিয়ায় মাত্র হাতে গোনা কয়েক ডজন মানুষ সেইরকম সুখী আর বিলাসী জীবনযাপন করত, তাদের সকলেই ছিল রাজনীতিবিদ)। তাহলে ব্যবস্থাটা আদৌ চলছিল কেমন করে? কারণ মানুষ একসময় বিশ্বাস করত। আমি এরকম দাবি করছি না যে লোকে মনের আনন্দে বিপ্লবের মাতৃভূমির জয়গান গাইতে গাইতে কাজ করতে যেত। আমি বলতে চাইছি, তারা কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলো থেকে ততটাও সুবিধা নিত না যতটা নেওয়া সম্ভব (যেটা শেষ বছরগুলোয় শুরু হয়েছিল)। উপরন্তু সেই সময় কর্তৃপক্ষও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ব্যবস্থাটায় বিশ্বাস করত, ফলে অবাধ্য এবং সুযোগসন্ধানীদের নির্মম শাস্তি দেওয়া হত। (স্তালিন যেমন ব্যর্থ সেনাপতিদের গুলি করে মারতেন)।
ছোট পরিসরে আমরা এই ব্যাপারগুলো সব সময়েই দেখতে পাই। বাজার অর্থনীতির ব্যবস্থাটা চলমান থাকার জন্য অংশগ্রহণকারীদের বিশ্বাসের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু বাজার অর্থনীতির মধ্যে অবস্থিত কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতি, অর্থাৎ কর্পোরেশনগুলির জন্য, তা জরুরি। সকলেই জানে শুধুমাত্র আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে একটি কোম্পানি সফল হতে পারে না; সে জন্য অবশ্যই একটি নৈতিক মানদণ্ড, একটি লক্ষ্যমাত্রার প্রয়োজন হয় যাতে লোকে শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে সংস্থার ভালোমন্দের দিকে তাকিয়েও কাজ করে। কপাল ভালো যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে একটি সংস্থা ব্যর্থ হয়ে ডুবে গেলেও সাধারণত সমস্ত সমাজটা তার সঙ্গে গোল্লায় যায় না, আর রক্তাক্ত বিপ্লব ছাড়াও পুঁজিবাদের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।
মানুষ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করা ছেড়ে দিল কেন? একটা কারণ হচ্ছে সময়: সত্তর বছর ধরে বিপ্লবী চেতনা একই ভাবে অটুট থেকে যাবে এ আশা করা একটু বাড়াবাড়ি। এছাড়াও পুঁজিবাদের অপ্রত্যাশিত বিকাশ হয়তো আর একটা কারণ। আশির দশক নাগাদ রাশিয়ার অভিজাতরা বিলক্ষণ বুঝেছিল যে তাদের দেশ পুঁজিবাদী দেশগুলোকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দেওয়া দূরে থাক, উল্টে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। রাশিয়া আর নতুন প্রযুক্তির সুবিধাগুলো নিতে পারছে না, পশ্চিমের দেশগুলোর নতুন প্রতিযোগী হয়ে উঠছে বরং এশিয়ার উঠতি দেশগুলোর অর্থনীতি। সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সাম্যবাদ ইতিহাসের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠার দাবি হারিয়ে ফেলেছিল, আর হয়তো বা সে জন্যেই সোভিয়েত ভেঙে গেল।
শেষে এটুকুই বলা যায়, পুঁজিবাদ জয়ী হয়েছে কারণ তা নৈরাশ্য এবং বিশ্বাসহীনতার সমস্যাটার মোকাবিলা করার মত শক্তপোক্ত বনেদের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে ধরেই নেওয়া হয় সমস্ত মানুষ স্বার্থপর, তারা শুধুমাত্র নিজেরটুকু নিয়েই ভাবছে। গত দেড় শতাব্দী ধরে অনেক মানুষ আরো ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখেছিল, এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা ভেবেছিল যা স্বার্থপরতার বদলে মানবচরিত্রের মহোত্তর গুণগুলোর উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এটাই দেখা গেল যে দীর্ঘমেয়াদে স্বপ্ন দিয়ে কাজ চালানো যায় না। স্বার্থপরতা দিয়ে, যায়।
⧫⧫⧫⧫⧫
টীকা:
* Russia's War: Blood Upon the Snow
* গ্রেট পার্জ: স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় সংঘটিত একটি রাজনৈতিক দমনমূলক অভিযান, যা চলেছিল ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত। বিপুল সংখ্যক সরকারি আধিকারিক, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, রেড আর্মির অফিসার এবং ধনী জমির মালিকদের দেশদ্রোহিতা, বিশ্বাসঘাতকতা প্রভৃতি অভিযোগে অভিযুক্ত করে হত্যা করা হয়। সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশবাহিনী এনকেভিডির নেতা নিকোলাই ইয়েঝভ ছিলেন গ্রেট পার্জের মূল কাণ্ডারী। দানব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্রষ্টাকে সংহার না করে থামে না, ইয়েঝভ নিজেও স্তালিনের নির্দেশে বছর দেড়েক বাদে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। গ্রেট পার্জে নিহত মানুষের সংখ্যাটা নিয়ে দ্বিমত আছে, মোটামুটিভাবে ধরা হয় সাত থেকে বারো লক্ষ। কামেনেভ, জিনোভিয়েভ, বুখারিনের মত বলশেভিক বিপ্লবের দিকপালদের এই সময়ে হত্যা করা হয়েছিল। বাঙালী কমিউনিস্ট বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় গ্রেট পার্জের অন্যতম শিকার।
* জিডিপি: Gross Domestic Product. একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছর) কোনো অর্থনীতির উৎপাদিত সমস্ত পণ্য (final goods) ও পরিষেবার মোট আর্থিক মূল্যকে বলা হয় (নমিনাল) জিডিপি। রিয়েল জিডিপি হল মূল্যবৃদ্ধির কারণে দাম বাড়ার বিষয়টি বাদ দিয়ে হিসেব করা জিডিপির পরিমাণ (রিয়েল জিডিপি মাপতে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিবর্ষের দ্রব্যমূল্যকে ধ্রুবক হিসেবে ধরা হয়)।
ধরা যাক, একটি দেশ অশ্বডিম্ব উৎপাদন করে। ২০১৭ সালে তাদের উৎপাদিত অশ্বডিম্বের পরিমাণ এক কোটি তোড়া, ২০১৮ সালে দুই কোটি তোড়া। এক তোড়া অশ্বডিম্বের মূল্য যদি ২০১৭ সালে হয় এক টাকা এবং ২০১৮ সালে দুই টাকা, তাহলে ২০১৭ সালের রিয়েল এবং নমিনাল জিডিপি এক কোটি টাকা আর ২০১৮ সালের নমিনাল জিডিপি চার কোটি টাকা, এবং রিয়েল জিডিপি দুই কোটি টাকা।
* কেন্দ্রীয় অর্থনীতি: যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ, সাধারণত দেশের সরকার, প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে (যথা, কোন পণ্য উৎপাদিত হবে, কী পরিমাণে হবে, তার দাম কী হবে ইত্যাদি)। ১৯৯১ সালের আগে ভারতীয় অর্থনীতির ধাঁচটা ছিল এই রকমের।
* বাজার অর্থনীতি: যেখানে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেয় না, বরং সেটা নির্ধারিত হয় বাজারের চাহিদা ও যোগানের নিয়মে। ভারতীয় অর্থনীতি এই মুহূর্তে বাজার অর্থনীতি ও কেন্দ্রীয় অর্থনীতির সংমিশ্রনে সৃষ্ট একটি মিশ্র অর্থনীতি, যদিও ১৯৯১ সালের পরে ঝোঁকটা বাজার অর্থনীতির দিকেই বেশি।
* প্রণোদনা: Incentive. যা একজন ইকনমিক এজেন্টকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে অনুপ্রেরণা (আদি অর্থে) বা উৎসাহ দেয়। যথা, গেম অফ থ্রোনস দেখে ফেললে আপনি অ্যাজর আহাই নিয়ে ক্রাশের সাথে আলোচনাটা জমিয়ে করতে পারবেন, এটা হল সিরিজটা দেখে ফেলার পক্ষের ইনসেন্টিভ।
No comments:
Post a Comment